sristymultimedia.com

ঢাকা, সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২ পৌষ ১৪২৬


সভ্যতার বিকাশে শিক্ষক

১২:০৭এএম, ২৩ এপ্রিল ২০১৯

পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানীয়, দায়িত্বশীল এবং অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকারি পেশা শিক্ষকতা। শিক্ষকতা একজন মানুষ যখন পেশা হিসেবে নেয়, স্বাভাবিকভাবেই তিনি একটি অনন্য মর্যাদার অধিকারী হন কারণ তিনি শিক্ষক। বিশাল এই দুনিয়ায় একজনের কোন শিক্ষক নেই এমন মানুষ খুজে পাওয়া দুষ্কর। তাই শ্রেনী, মর্যাদা, এবং সব পেশার মানুষই শিক্ষকদেরকে জগতের অন্যসব স্থান থেকে আলাদা করে দেখেন। একজন শিক্ষক আরো গৌরবান্বিত হন যখন তার নিজেরই কোন ছাত্র তারই মত কিংবা ক্ষেত্রবিশেষ তাকেও ছাড়িয়ে যায়। ছাড়িয়ে যাওয়াটা আরো বেশি গৌরবের। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা ছাড়িয়ে যেতে চাইলে বিখ্যাত না হয়ে কুখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ছোটবেলা থেকেই একটা বিষয় আমাদের সবসময়ই শিখতে এবং চর্চায় রাখতে হয়েছে, সেটা হল ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক দিয়ে এখনও কালজয়ী হয়ে আছেন আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর পুর্বের জগৎ বিখ্যাত চারজন দার্শনিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বিজ্ঞানী ও সমালোচক এবং দিগ্বিজয়ী। তারাই পৃথিবী তৈরীর সব থেকে বড় কারিগর, পর্যায়ক্রমে সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল এবং আলেকজান্ডার। পর্যায়ক্রমিক তাদের সম্পর্ক শুধু গদ বাধা ছাত্র-শিক্ষক ছিল না। একজন অন্যজনকে মানুষ হওয়ার, ভালো চিন্তা করার, দুনিয়ার প্রতি অবদান রাখার জন্য অনুপ্রাণিত করত।

আমাদের গদ বাধা ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ছাত্রদেরকে ফার্মের গরু বা ছাগল অথবা কোন যন্ত্র ক্ষেত্রবিশেষ ভোগ্যপণ্যও মনে করে। শিক্ষক দ্বারা ছাত্রী এমনকি ছাত্র লাঞ্চনাও আমাদের দেশে একটা নিয়মিত ঘটনা। আমরা এই লাঞ্চনার কখনও কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি না বলেই হয়তো আজ মহামারী আকারে রূপ নিয়েছ। গত কিছুদিন ধরে আমাদের দেশের সবথেকে বেশি আলোচিত বিষয় ফেনীর সোনাগাজিতে নুসরাত জাহান রাফির শরীরে অগ্নিসংযোগ এবং তার মর্মান্তিক মৃত্যু। যা আমাদের দেশ এবং দেশের বাইরে সবাইকে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে। এতকিছুর ভেতরেও ঝিনাইদহ শহরের আল হেরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তিন ছাত্রীর প্রতি যৌন আচরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা তো ফুলের কলির চেয়েও ছোট। এ ধরনের বিকারগ্রস্ত মানুষ সে যেই হোক সমাজ-জাতি কিংবা শিক্ষতার কলঙ্ক। তাদের জন্য একই সাথে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভুক্তভোগী তেমনি সম্মানহানি হয় সবচেয়ে মহৎ পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের। আমাদের এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা থেকে শহরের আধুনিক স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত।

যৌন নির্যাতনে অথবা হয়রানিতে যে শুধু শিক্ষকরাই এগিয়ে আছেন এমনটি বলা যায়না। তবে এভাবে বলা যায় যে অন্যদের চেয়ে এনাদের দৌড়ের গতিটা একটু বেশিই বটে। এটা এমন একটি ব্যাধি যা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরীর সেই বিখ্যাত উক্তিটি অত্যন্ত কার্যকারি, “ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়”। আমাদের এই ব্যাধি থেকে বের হয়ে আসাটা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং। কারণ তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হয়েও অনেক প্রতিকুলতার মাঝে অন্যান্য অনেক বড়-বড় দুর্যোগ থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পেরেছি। ক্ষুধা-দারিদ্র্য, নিরক্ষতা, এমনকি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীলতার দিকে। এক্ষেত্রে আমরা যেমন বিশ্বে রোল মডেল, তেমনি আরো একটি বিষয় চলে এসেছে যেখানে আমরা বিশ্বের বুকে নিজেদেরকে আরো উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরতে পারি। তাই দেশ ও সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি এবং অনিরাপদ জীবন তার থেকে বের হয়ে আসাটাকে এখন আমাদের প্রথম সমস্যা হিসেবে ধরে গুরুত্বসহকারে দমন করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সবচেয়ে কার্যকারি হবে বলেই মনে হয়।

ধর্ষন করাটা কোথাও আবার অদ্ভুত শখ ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরে নেয় অনেক বিকৃত মনের মানুষ!ইন্ডিয়ার উত্তরখন্ডের দর্জি সুনীল তার এক জঘন্যতম উদাহরণ। যে আড়াইহাজার মেয়েকে ধর্ষনের চেষ্টা করে পাঁচ’শ জায়গায় সফল হয়েছে। স্কুল-কলেজের গেটের সামনে দাড়িয়ে থাকা অথবা যাদের দায়িত্ব বিভিন্ন গলিগুলো পাহারা দেওয়া তাদের ভেতরে এমন বিকৃত চিন্তাগুলোর চর্চা স্বাভাবিক ভাবেই সাধারণদের চেয়ে একটু বেশি হয়। পত্রিকার ভেতর সবচেয়ে কমন যে বিষয়টা থাকে সেটি হল এই মহামারী যা কিনা, খুন-হত্যা, জুলুম-রাহাজানিকেও কালের বিবর্তনে পিছু হটিয়েছে। এটা এমনই একটি ভয়াবহ অবস্থা হিসেবে দাঁড়িয়েছে যে বাবা-মেয়েকেও সম্পর্কটা ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য হার না মানার প্রচেষ্টা চালায়।

এই বিষয়টি এখন এতই মহামারী আকারে রুপ নিয়েছে যে সারা বিশ্বকে গ্রাস করে ফেলেছে। গতবছর ছিল এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কারণ আমরা অধিকাংশ মানুষ যাদের ভেতর হলিউড, বলিউড ফ্যান্টাসি কাজ করে, যাদেরকে আমরা মুক্তমনা ও চিন্তার অধিকারী বলে মনে করি, এই ব্যাধির আক্রমণ সেখানেও বিস্তার লাভ করেছে। ওই দুই ইন্ডাস্ট্রির বাঘা বাঘা প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতাদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনা হয়েছিল। সবচেয়ে লক্ষনিয় বিষয় যারা, এই অভিযোগ এনেছেন তারাও অনেক নামি-দামি অভিনেত্রী!এদের মধ্যে এঞ্জেলিনা জোলি, এমা স্টোন ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মত অভিনেত্রীরাও আছেন।

সমস্যা আরো তীব্রতর হয়, যখন এই সমস্ত নর-পিশাচগুলোর সাফাই গায় দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনপ্রয়োগকারীর কর্মচারী থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যন্ত! এবং তারাই দায়িত্ব নেয় যাতে আক্রমণকারি কোনভাবেই আইনের জালে জড়িয়ে না পড়ে। তেমন দৃষ্টান্ত সবচেয়ে লক্ষনীয় হয়েছে তনুকে কেন্দ্র করে। আজো আমরা তনু হত্যার বিচারের কোন সমাধান পেলাম না! বিচারের আওতায় আনতে গেলেই বেধে যায় নানান ধরনের উদ্ভট সব সম্পর্ক। উনি অমুকের পাশের বাড়ির খালাতো ভাই কিংবা তমুকের চাচার আত্মীয়ের কলিগের ভাই। ভিকারুননিসা স্কুলের পরিমলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ একটি বহুল আলোচিত ঘটনা। আমাদের দেশে ছাত্রী হয়রানীর মামলা এবং সবচেয়ে বড় বিচার হয় তখন যেটা সারাদেশব্যাপি তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তারপরও এই সমস্ত সমস্যা থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারিনি।

একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যখন এই ধরনের আপত্তিকর ঘটনা ঘটে তখন সারা প্রতিষ্ঠানব্যাপি বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্র-বিন্দুতে পরিনত হয়। শিক্ষার্থী এমনকি শিক্ষকদের মাঝেও বিষয়টি তখন নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে। যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার তীব্র আশংকা তৈরি হয়, এমনকি কোথাও কোথাও পরবর্তীতে এটি বাস্তবতা হিসেবে রূপ নেয়। এই ভাইরাস আর যাতে আমাদের সমাজকে আক্রমণ করতে না পারে তার জন্য যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অতীব জরুরী বলেই মনে করছি।

আব্দুল্লাহ আল মামুন
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের অন্যান্য খবর

উপরে