ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬


‘কখনো আইনের বাইরে যাইনি’

২০১৯ মে ১৯ ১০:১৮:৪৩

শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) দীর্ঘ ৮ বছর ধরে চেয়ারম্যান হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন ড. এম. খায়রুল হোসেন। এই সময়ে তার নেতৃত্বে ৮০টি সংস্কার করা হয়েছে। যিনি শেয়ারবাজারের এক ক্রান্তিলগ্নে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সম্প্রতি শেয়ারবাজারে ঘটে যাওয়া নানা বিষয় ও বাজারের ভবিষ্যত নিয়ে বিজনেস আওয়ারকে সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সাক্ষাতকার নিয়েছেন বিজনেস আওয়ারের স্টাফ রিপোর্টার রেজোয়ান আহমেদ। যার কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

খায়রুল হোসেন বলেন, ২০১৭ সালে ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান বোর্ডে ৩৬টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। যার ২২টি বা ৬১ শতাংশ কোম্পানির শেয়ার দর ইস্যু মূল্যের নিচে নেমে এসেছে। এছাড়া একই বছরে মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়া ৮৮টি (এসএমইসহ) কোম্পানির মধ্যে ১৯টির বা ২২ শতাংশের দর ইস্যু মূল্যের নিচে নেমে এসেছে। সেখানে কেউ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়ার (সেবি) বিরেুদ্ধে মিছিল করেনি। কিন্তু আমাদের দেশে ভিন্ন। এখানে যেকোন কিছুতেই রাস্তায় দাড়িঁয়ে পড়তে হয়। এছাড়া পেছন থেকে কেউ উস্কানি দিলেও রাস্তায় নেমে পড়ে। ডিএসইর স্ট্যাটেজিক পার্টনার সাংহাই ও সেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানী Non-performing করছে এবং ইস্যু মূল্যের নীচে রয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারেও প্রায় এরকম চিত্র বিদ্যমান।

তিনি বলেন, বর্তমান কমিশন যতগুলো কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিয়েছে, লেনদেনের প্রথম দিন তার একটিও ইস্যু মূল্যের নিচে নামেনি। এছাড়া প্রত্যেকটি আইপিওতে কয়েকগুণ আবেদন জমা পড়ে।

প্রিমিয়াম বেশি দেওয়া নিয়ে একসময় স্টেকহোল্ডাররা সমালোচনা করত বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। এখন প্রিমিয়াম চাওয়া কোম্পানির ক্ষেত্রে দর নির্ধারণ স্টেকহোল্ডার তথা যোগ্য বিনিয়োগকারীদের হাতে দেওয়া হয়েছে। যারা কোম্পানির যোগ্যতার চেয়েও বেশিতে দর প্রস্তাব করে। এক্ষেত্রে দায়ভার কার? নাকি এটিও কমিশনের?

তিনি বলেন, একটি কোম্পানির আইপিও অনুমোদনে ইস্যু ম্যানেজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা সবকিছু ঠিক ঠাক করে ফাইল দাখিল করে। এর আগে নিরীক্ষক ওই কোম্পানির আর্থিক হিসাব যাছাই করে। এরমধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জ থেকেও সেই ফাইল যাছাই-বাছাই করা হয়। এরপরে কমিশন যাছাই করে দেখে আইপিও’র সকল শর্ত পরিপালন হয়েছে কিনা। এরপরে আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয়। এতোকিছুর পরেও যদি ম্যানেজম্যান্টের কারনে তালিকাভুক্তির পরে একটি কোম্পানি পারফরমেন্স খারাপ হয়ে যায়, তাহলে কি করার থাকে। এরপরেও স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ চাইলেই আইপিওতে আসতে চাওয়া কোম্পানি সরেজমিনে পরিদর্শন করার সুযোগ দেওয়া হবে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ভালো কোম্পানি আনতে আমরা সরকারি পর্যায়ে আলাপ আলোচনা অব্যাহত রেখেছি। এ নিয়ে কমিশন কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া বেসরকারি মোবাইল অপারেটর রবির সঙ্গে আলাপ আলোচনা হয়েছে। তারা কিছু প্রণোদনা চেয়েছে। হয়তো কোম্পানিটি শেয়ারবাজারে আসবে। এছাড়া রূপালি ব্যাংক ১৫ শতাংশ শেয়ার অফলোড করতে পারে এবং পেট্রোবাংলার ২টি কোম্পানিকে আনার চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, দেশের ভালো ভালো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার জন্য স্টক এক্সচেঞ্জ ও ইস্যু ম্যানেজারের গুরুত্‌পূর্ণ ভূমিকা রাখা দরকার। স্টক এক্সচেঞ্জেরে এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।

শীঘ্রই তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পরিচালকদের ব্যক্তিগতভাবে ২ শতাংশ ও সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারন নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। যেসব প্রতিষ্ঠানে এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হবে, তাদের জন্য বোনাস শেয়ার ইস্যু, শেয়ার বিক্রি, একীভূতকরন ইত্যাদি বন্ধ করা হবে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে অযৌক্তিকভাবে বোনাস শেয়ার ইস্যু করার সুযোগ থাকবে না। কেনো বোনাস শেয়ার দিতে চায় এবং কোথায় ব্যবহার করবে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকতে হবে। অন্যথায় বোনাস শেয়ার দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

গত কয়েক মাসের সূচকের যে পতন হয়েছে, সেখানে অনেকগুলো কারণ ছিল বলে জানান ড. হোসেন। তারল্য সংকটের পাশাপাশি টিআইএন নিয়ে ধোয়াশা, গ্রামীণফোনের ট্যাক্স সংক্রান্ত জটিলতা, একটি কোম্পানীর বিধি-বহির্ভূতভাবে বিদেশীদের কাছে শেয়ার বিক্রির প্রচেষ্টা ও গুজব। কৃত্রিমভাবে এই সংকটের সৃষ্টি করায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তিনি বলেন, হঠাৎ করে প্লেসমেন্ট নিয়ে আলোড়ন তোলা হয়। কিন্তু প্লেসমেন্ট শেয়ার কে পাবে, সেটা কমিশন ঠিক করে দেয় না। তবে এই কমিশনই প্লেসমেন্টের নৈরাজ্যে লাগাম টেনেছে। লাখ লাখ মানুষের পরিবর্তে ১০০ জনের মধ্যে প্লেসমেন্টে শেয়ার ইস্যু নামিয়ে আনা হয়। এছাড়া প্লেসমেন্ট ক্রেতাদের টিআইএন প্রদান বাধ্যতামূলক করা ও নগদ লেনদেন বন্ধ করা হয়। আর প্লেসমেন্টে সব শেয়ার ১০ টাকা করা হয়। তবে কেউ বেশি দরে কিনলে, তার দায়ভার তাকেই নিতে হয়।

প্লেসমেন্ট ব্যবসায়ীদেরকে অনেক ঝুঁকি নিতে হয় বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। দীর্ঘদিন যেমন অপেক্ষা করতে হয়, অনেক সময় আইপিও বাতিলও হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে প্লেসমেন্টধারীদের বিনিয়োগটা আটকে যায়। তবে আইপিও অনুমোদন পেলে মুনাফা করতে পারে।

তিনি বলেন, শেয়ারবাজারের ২টি মার্কেট। একটি প্রাইমারি ও আরেকটি সেকেন্ডারি। প্রাইমারি মার্কেটের মাধ্যমে শিল্পায়ন, অবকাঠামো ও সেবা খাত উন্নয়নে অর্থায়ন করা হয়। আর সেকেন্ডারি মার্কেটের মাধ্যমে বিনিয়েয়াগকৃত টাকা মুনাফাসহ ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকে। একটি দেশের শেয়ারবাজার গড়েই উঠে শিল্পায়ন ও অন্যান্য খাতে দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি সরবরাহের উৎস হিসেবে কাজ করে। অন্যথায় শেয়ারবাজারের দরকার ছিল না। কাজেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল ও তরান্বিত করার জন্য আইপিও প্রয়েজিনীয়তা রয়েছে। ভাল আইপিও নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে সবার আরো বেশী উদ্যোগী হতে হবে।

খায়রুল হোসেন বলেন, আইপিও বন্ধ করে দিলে শিল্পায়ন ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আর আইপিও না থাকলে তো শেয়ারবাজারেরই দরকার পড়ে না।

তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে অতি সহজে ঋণ পাওয়া এবং তা ফেরত না দেওয়ার সুযোগ থাকায়, শেয়ারবাজার ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন শেয়ারবাজারের কাজ হলেও ব্যাংক করছে। যা মোটেই ঠিক না।

গত ৮ বছর ধরে কমিশনে রয়েছেন জানিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, আমি কখনো আইনের বাইরে যাইনি। কোন একক প্রতিষ্ঠানের দাওয়াতে যাই না। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সকল অংশীজনদের সমন্বয়ে শেয়ারবাজারের উন্নয়নে নিজের সীমিত জ্ঞানকে কাজে লাগাবার প্রচেষ্টা করেছি।

খায়রুল হোসেন বলেন, গত ২৮ এপ্রিল শেয়ারবাজারের চলমান অবস্থা নিয়ে গণভবনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর, অর্থ সচিব ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব ও অর্থমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠক হয়। সবাইকে শেয়ারবাজারের জন্য কাজ করতে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া ওইদিন শেয়ারবাজারের বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যা পরবর্তীর্তে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয়। তবে এর আগে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করা হয় এবং তাদের পরামর্শ নেওয়া হয়। যাতে কেউ অভিযোগ তুলতে না পারে।

তিনি বলেন, শেয়ারবাজারের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় যেকোন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিয়েছেন। মাননীয় অর্থমন্ত্রীও এ ব্যাপারে সকল সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছেন। ইতোমধ্যে ডিএসই-তে স্মল ক্যাপিটাল প্লাটফর্ম চালু করা হয়েছে। বন্ড মার্কেট উন্নয়নসহ নতুন নতুন ইন্সট্রমেন্ট বাজারে নিয়ে আসার আইনি কাঠামো চুড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এতে করে বিনিয়োগকারীর জন্য বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ তৈরী হবে এবং একই সাথে বাড়বে বাজারের গভীরতা।

বিজনেস আওয়ার/১৯ মে, ২০১৯/আরএ

উপরে