ঢাকা, সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬


জলবায়ু রাজনীতি কি শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রায় পৌছাতে পারবে?

২০১৯ মে ২২ ০১:৫৩:৩৭

গত সপ্তাহে ইংল্যান্ডের আভিজাতিক শহর শ্রেসবারীতে একটি প্রচারণা ও আলোচনার আয়োজন করা হয় "জলবায়ু পরিবর্তন" শিরোনামে। সংগঠনটি খুশী হয় যখন তাদের সাথে দেড়শমতো জনগণ একাত্মতা প্রকাশ করে। এমনকি তারা আরো বেশি আনন্দিত হয় যখন সবাই মিলে বলে তারা বর্জন করতে প্রস্তুত আছে বিমান, বয়েলার এবং গাড়ি, মাংসের খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া, এমনকি ক্যাপিটালিজমকে পরাস্ত করবে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি থেকে রক্ষা করার জন্য।

কিন্তু এটা ছিল শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক বাতাসের অংশ যেটা শুধুমাত্র মধ্য ইংল্যান্ডের ভেতরেই ঘুর্নির মত করে ঘুরেছে। শ্রেসবারি মোটামুটি আরো অন্যান্য একশোর বেশি সংগঠনের মত, যোগদান ও ঘোষণা করেছে জরুরি জলবায়ু এবং অঙ্গিকার করেছে যে আগামী এগারো বছরের মধ্যে কার্বন-নিরপেক্ষ অবস্থা তৈরী করতে সক্ষম হবে এবং এ ক্ষেত্রে তারা প্রত্যেক সপ্তাহে কর্মসূচির আয়োজন করবে।

উদ্বিগ্নতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শুধু তাই নয় গত সপ্তাহে, বিশ্বে সেরা বিজ্ঞানীগন একটি উপযুক্ত প্রমাণসহ আঠারোশো পৃষ্ঠার নথিপত্র দিয়েছে যা বিশ্ববাসীকে চরমভাবে আতঙ্কিত করেছে। যেখানে বলা হয়েছে জীব বৈচিত্রের পরিবর্তন মানব জাতির জন্য ততটাই হুমকি স্বরূপ যতটা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘটতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় বায়ুমন্ডলে কার্বন লেভেল গত আট লাখ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌছেছে।

তাহলে এই মুহূর্তে এটাই কি এখন বিশ্ব রাজনীতিবিদগনের কাছে আলোচ্য সূচির উপরের দিকে থাকার কথা না যেখানে কঠিন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হবে যত দ্রুত সম্ভব পরিবেশ নিয়ে কাজ করা এবং জনগণেরও তাদের সাহায্য করা দরকার? তারা চেষ্টা করেও যদি পার্টির লক্ষ্য পূরন করতে না পারে, তাদের বিশ্বাস করতে হবে যে তাদের বৈধতা আছে পরিবেশ নিয়ে কাজ করার এবং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে জনগণের কল্যাণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন গঠন করা। জলবায়ু পরিবর্তন কি কোন ভাবে রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারবে?

গত কয়েক মাস ছিল এ বিষয়ের মুল আলোচ্য বিষয়। ডেভিড অ্যাটেন বোরাফের ডকুমেন্টারি উপস্থাপিত হয়েছে, দেড় মিলিয়ন শিশু এর উপর প্রতিবাদ করেছে এবং জলবায়ুর উপর প্রভাব বিস্তারকারী রাজনৈতিক ধারার প্রতিও তাদের ক্ষুন্ন মনোভাব ব্যক্ত করেছে। শিশুদের এই আন্দোলনের সাথে পরে বিভিন্ন বয়সের নাগরিকগন একাত্বতা প্রকাশ করেছে এবং তাদের মনোভাব এই সমস্যাকে অতিক্রম করার জন্য সরকারকে এটা জাতীয় সমস্যা এবং সর্বাত্বক অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে।

যুক্তরাজ্য সরকার এই সমস্যা অতিক্রম করার জন্য বিশ্ব দরবারে অগ্রজ ভূমিকা পালন করলেও এখন পর্যন্ত তারা এই আন্দোলনকে সরাসরি সমর্থন না করে, তারা ফ্লাইং এবং কনস্ট্রাকশনের কাজ গুলোকে আরো বেশি উন্নত করছে। তাদের মূলাধারার উন্নয়নের পথকে আরো প্রশমিত করছে। এক ব্রেক্সিট নিয়েই প্রায় তিন বছর পার করে দিয়েছে। অন্যান্য বিষয়গুলো তাই অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবে চোখে পড়ে। বিশ্ববাসীর এখন সবচেয়ে বড় উদ্বিগ্নতার কারণ এক জলবায়ু পরিবর্তন ও দুই পরমাণু হুমকি এবং তিন অভিবাসন সমস্যা।

ক্যাম্ব্রিজ উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ স্যার পার্থ দাসগুপ্ত জীব বৈচিত্র্যের উপর গবেষণা করে প্রতিবেদন জমা দেন, যেমনটি ২০০৬ এ লর্ড স্টার্নও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন অর্থনীতির উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে। স্টার্নের এই ৭০০ পেজের রিপোর্ট নতুন মাত্রায় আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু এটা ছিল তের বছর আগের ঘটনা, এর মধ্যে জলবায়ুর অর্থনীতির উপর আরো অনেক উচ্চ মানের গবেষণা হয়েছে। নতুন কোন রিপোর্টই এখন আর তেমন প্রয়োজন পড়ে না কারণ সব রিপোর্টের যুক্তিগুলো প্রায় একই। এখন যত দ্রুত সম্ভব জীব বৈচিত্র্য ও জলবায়ু সমস্যা সমাধান করাটাই মুখ্য যদিও এর জন্য প্রচুর অর্থের যোগান দিতে হবে কিন্তু দেরি করলে এই অর্থ মুল্য আরো অনেক গুন বেড়ে যাবে। তাই দাস গুপ্তের রিপোর্টের মুল কেন্দ্রবিন্দু যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাছাড়া, এখন আশার আলো এই যে, ত্রিশ বছরের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে যেখানে কার্বন নিঃসরনের পরিমাণ শূন্যে নেমে আসবে যদিও কিছু দেশ বলছে এটা অত্যন্ত কঠিন হবে। বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল এবং সুইডেন ইইউকে পরামর্শ দিয়েছে ২০৫০ কে লক্ষ্য করে কার্বন-নিরপেক্ষ অবস্থা তৈরী করতে এবং ইইউর বাজেটের পঁচিশ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তন এর উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দিতে। তবে এখন অধিকাংশ ভুক্তভোগীরা খুব কমই লক্ষ্য করেছে যে, ত্রিশ বছরের মধ্যে তারা এই সমস্যা থেকে নিষ্কৃতি পাবে। যারা খেয়াল করেছে তারা নিশ্চয় দেখেছে, বৃটেন গত একশ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে কয়লার ব্যবহার ছাড়ায়। এখন জনগণের উচিৎ ইলেক্ট্রিক গাড়ি, পরিবেশ বান্ধব ফ্রীজ এবং হিটিং সিস্টেম ব্যবহার করা এবং সরকারের উচিত প্রচুর সোলার প্যানেল সরবরাহ করা, বনায়নের প্রতি আরো গুরুত্ব দেওয়া এবং বিভক্তি করণ করা কিন্তু এগুলো হল সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় পরিবর্তন।

উন্নত দেশগুলো আবার এক্ষেত্রে দুই রকম মনোভাব দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যে যে সমস্ত অনুন্নত দেশ গুলো জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়েছে তারা উন্নত দেশগুলোর দিকে চলে যাচ্ছে, তাতে করে উন্নত দেশগুলোও অভিবাসী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। শুধু তাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ধান গম থেকে শুরু করে যেকোনো ধরনের ফসলের অনেক ক্ষতি হচ্ছে এবং উৎপাদন কমে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ইউএন বলেছে, তাদের কাছে আড়াই হাজারের মত অভিযোগ জমা পড়েছে যেগুলোর বিষয় জীবাশ্ম-জ্বালানি, পানি, খাদ্য এবং জমি। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীব বৈচিত্র্য এই সংখ্যা আরো বাড়াবে বলে তারা মনে করছে। তাই এই একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জলবায়ু পরিবর্তনকে রুখে দেওয়া এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর ও বসবাস উপযোগী জায়গা রেখে যাওয়া। যেমনটি কবি সুকান্ত বলেছিলেন, "এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান ; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠে।"

আব্দুল্লাহ আল মামুন,শিক্ষার্থীইংরেজি বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

উপরে