ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬


ফেঁসে যাচ্ছেন ওসি মোয়াজ্জেম

২০১৯ মে ২৭ ০৮:৪৮:৪৭

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : ফেনীর মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের ঘটনার পর তাকে থানায় জেরা করার দৃশ্য নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করেছেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। তবে তিনি ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়াননি।

ওসির বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এ কথা বলেছে। গতকাল রবিবার পিবিআই ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে।

পিবিআইর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অভিযোগের আংশিক সত্যতা মিলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করা হলেও তা তদন্তে পাওয়া যায়নি।

গত ২৭ মার্চ মাদরাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে নুসরাতকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন তাঁর মা শিরিন আক্তার।

ঘটনার এক সপ্তাহ পরে এই শিক্ষার্থীকে আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তোলপাড় শুরু হলে ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন এক আইনজীবী।

এরপর তাঁকে সোনাগাজী থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এদিকে এ সপ্তাহের মধ্যে নুসরাত হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনও দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

এখন পর্যন্ত আলামত, জবানবন্দি ও সাক্ষী-প্রমাণ থেকে ১৬ জনের সম্পৃক্ততা মিলেছে। পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত ২১ জনের মধ্যে এই ১৬ জন আছে, যারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে হত্যায় অংশ নিয়েছে।

পুলিশের তদন্তকারী বিশেষ ইউনিট পিবিআই প্রধান উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম থানায় নুসরাতের ভিডিও ধারণের কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়াননি বলেও দাবি করেছেন।

আমরা তদন্তে ভিডিও ধারণ ও নুসরাতকে জেরা করার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। ইতিমধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছি। এজাহারে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তার আংশিক সত্যতাও পেয়েছি। সে অনুযায়ী প্রতিবেদন দিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম নিজেই তাঁর মোবাইলে ভিডিও ধারণ করার পর সজল নামে এক ব্যক্তির কাছে দিয়েছিলেন। তার মাধ্যমেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

জানা গেছে, সজল স্থানীয় এক সাংবাদিক। সজলসহ অনেকেই ওই ভিডিও ফুটেজটি পান। এদের কেউ তা সামাজিক মাধ্যমে ছেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ মাসের বাকি তিন-চার দিনের মধ্যেই হত্যা মামলার চার্জশিট দিয়ে দেব। আমাদের কাজ শেষ পর্যায়ে।

পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় ১৬ জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। সেগুলো যাচাই চলছে। তাদের মধ্যে ১২ জনের জবানবন্দি আছে। হত্যায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত পাঁচজন। বাকিরা পরিকল্পনা ও সহায়তায় জড়িত।

নুসরাত হত্যার ঘটনায় পুলিশ অভিযুক্তদের পক্ষ নিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠার পর গত ১৫ এপ্রিল সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।

নুসরাতকে আপত্তিকরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করায় ওসির বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনাও হয়। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিব্রত ও কাঁদতে থাকা নুসরাতের মুখের কাপড় সরিয়ে তাকে জেরা করছেন ওসি।

ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার অভিযোগে বলা হয়, আইনবহির্ভূতভাবে ভুক্তভোগী নুসরাতের বক্তব্য রেকর্ড করেন পুলিশ কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম। তিনি (তৎকালীন ওসি) খাসকামরায় নুসরাত জাহান রাফির ভিডিও ধারণ করেন।

পরে সেই ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল করা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় মামলা নেওয়ার আবেদন করা হয়। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।

প্রায় দেড় মাস পর তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন পিবিআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) রিমা সুলতানা। এরই মধ্যে অভিযুক্ত মোয়াজ্জেমসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে সোনাগাজী থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ (বর্তমানে বরখাস্ত) সিরাজ উদ দৌলার নাম এসেছে তদন্তে। সিরাজের নির্দেশ বাস্তাবায়নে তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাত্র জড়িত।

তাদের মধ্যে যারা সরাসরি নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে অভিযোগপত্রে তাদের নামই প্রথমে থাকবে। এরপর থাকবে সহায়তাকারীদের। শেষ দিকে নাম থাকছে সিরাজ ও তাঁর অনুসারীদের সহায়তাকারীদের।

তদন্তে কেরোসিন ঢেলে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার আলামত মিলেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক বিভাগ নুসরাতের পোশাকসহ জব্দকৃত আলামত পরীক্ষা করে পিবিআইয়ের কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।

যে গ্লাসে করে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢালা হয়েছে সেটি মাদরাসার সাইক্লোন শেল্টার ভবন থেকে জব্দ করা হয়েছে। এর আগে হত্যার সময় খুনিদের পরা বোরকাসহ বেশ কিছু আলামতও জব্দ করা হয়।

২৭ মার্চ নুসরাতকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে তার মায়ের দায়ের করা মামলায় সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ৬ এপ্রিল পরীক্ষা দিতে মাদরাসায় গেলে নুসরাতকে সাইক্লোন শেল্টার ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয় সিরাজের সহযোগীরা।

৮ এপ্রিল তার ভাই সিরাজকে প্রধান আসামি করে আটজনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতপরিচয় চার-পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নুসরাতের মৃত্যু হয়। হত্যার ধারায় যুক্ত মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় পিবিআইকে।

বিজনেস আওয়ার/২৭ মে, ২০১৯/এ

উপরে