ঢাকা, রবিবার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬


ডিজিটালের প্রতি মোহ কেন নিয়ন্ত্রণহীন আর সর্বগ্রাসী?

২০১৯ জুলাই ২০ ১৫:৫৭:৫৬

বিজনেস আওয়ার ডেস্কঃ গভীর আবেগ আর মোহ- বিষয় দুটি প্রকাশে মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য আলাদা করা বেশ কঠিন। হয়তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনার পুরনো সঙ্গীর খোঁজ করছেন। সেখানে ঢুকে আবিষ্কার করলেন, তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, তখনও আপনি তার নতুন সঙ্গীর সঙ্গে তোলা ছবিগুলোই দেখছেন।

আপনার পকেটে কম্পিউটার আর ২৪ ঘণ্টা ইনস্টাগ্রাম ও টুইটার ফিডে রয়েছে প্রবেশাধিকার। আসলে, হাতের নাগালে এসব থাকলে এ ধরনের অযৌক্তিক কাজ করার অন্ধ তাড়না থেকে বের হওয়াটা বেশ কঠিনই। কিন্তু ভাবুক মানুষের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে পারে, মোহগ্রস্ত আচরণ কীভাবে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়?

সামাজিক মনোবিজ্ঞানী এবং বিবিসির উপস্থাপক অ্যালেকস ক্রতোস্কি চেষ্টা করেছেন এর উত্তর খোঁজার। তিনি এমন কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন যাদের অন্যের বিষয়ে জানতে চাওয়ার প্রবণতা অনিয়ন্ত্রিত, বাধাহীন এবং সর্বগ্রাসী। এমন আচরণ থেকে বের হওয়ার উপায়ও বলেছেন তিনি।

বিপরীতমুখী ঈর্ষা
কিশোর বয়সে প্রেমে পড়েছিলেন জ্যাক স্টকিল। কিন্তু শিগগিরই তিনি তার বান্ধবীর অতীত জীবন নিয়ে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন। যদিও এর আগে আর কারও বিষয়ে এমনটি হয়নি তার। তিনি কখনও ঈর্ষান্বিত ছিলেন না। কিংবা বান্ধবী তাকে ধোঁকা দিতে পারে- এমন আশঙ্কাও ছিল না তার। কিন্তু তার বান্ধবীর সাবেক এক সঙ্গীকে নিয়ে একটি মন্তব্য হঠাৎ তার মস্তিষ্কে খুলে দেয় একটি সুইচ।

'এই একটি জিনিসই আমার মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে এনে দেয়', বলেন জ্যাক। তিনি বলেন, 'সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমি তার অতীতের খুব ছোট ছোট বিষয় নিয়েও খুব আগ্রহ বোধ করতাম। আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে তার প্রেমজীবন কেমন ছিল- সেসব নিয়ে খুব আগ্রহী ছিলাম আমি। আমি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টও দেখতাম। ভাবতাম, এই ব্যক্তিটি কেমন? কিংবা ওই ছবিতে কে? এবং এই কমেন্ট দিয়ে কি বোঝায়?'

জ্যাক তার সঙ্গীর অতীত নিয়ে কৌতুহলের এমন একটি চক্রে নিজেকে আবিষ্কার করলেন যা অগ্রাহ্য করা তার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। তিনি তার বিপরীতমুখী ঈর্ষাকে দমন করতে চাইলেন। ক্রমাগত অনলাইনে উত্তর খুঁজতেন। কিন্তু এটি তার ওই ঈর্ষাকে দমন না করে বরং তা আরো বাড়িয়ে দিতো।

সাইবার নজরদারি বা সাইবার স্টকিং
'সাইবার স্টকিং' শব্দটি বন্ধটি ২০১০ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে সংযুক্ত করা হয়। এটি হচ্ছে স্টকিং বা কোন ব্যক্তির ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত নজরদারির ডিজিটাল রূপ। যা শুধু অনলাইন জগতেই ঘটে থাকে এবং পুরোপুরি প্রযুক্তিগতভাবেই হয়।

স্টিনা স্যান্ডার্স একজন সাংবাদিক যিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার সম্পর্কে লেখালেখি করেন। ছয় বছর আগে তার সঙ্গী কোনো কারণ ছাড়াই ছেড়ে চলে যায় তাকে। এর কারণ জানতে তিনি তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো মোহগ্রস্তের মতো পর্যবেক্ষণ শুরু করেন।

স্টিনা বলেন, 'সে কেন আমাকে ছেড়ে গিয়েছিল- এ নিয়ে কখনও ভাবনা থেকে সরে আসতে পারতাম না। এর জন্য অনলাইনে প্রকাশিত তার নতুন সঙ্গীর সঙ্গে বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি দেখাই আমার একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়ায়।'

এটি একটি মোহ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর কয়েক বছর কেটে গেলেও এখনও তিনি তার ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক এবং টুইটার পেইজ দেখে। স্টিনা বলেন, 'আমি প্রায়ই আমার সাবেক ছেলে বন্ধুর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখি। এটি জানতে দেখি যে, সে এখন কী করছে? আমি এটিও দেখি, নতুন করে কাদের সঙ্গে ডেট করছে সে, আর তার নতুন সঙ্গীর এমন কী আছে যা আমার নেই?'

এ ধরনের সাইবার স্টকিং ধারণার চেয়েও অনেক বেশি।

ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টোর ভেরোনিকা লুকাক্সের পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন সাবেক সঙ্গীর মধ্যে ৯ জনই তাদের পুরনো সঙ্গীর ফেসবুক প্রোফাইল দেখে থাকে। সাইবার স্টকিং বেশ সহজ কারণ এতে আপনার সামনে আসার ভয় থাকে না।

কানাডার গবেষণাটি আরো প্রকাশ করে, ৭০ ভাগ মানুষ তাদের সাবেক সঙ্গীর প্রোফাইল তাদের মিউচুয়াল বন্ধুর অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেখে। এমনকি তারা যদি বন্ধু নাও থাকে কিংবা ব্লক করে দেওয়া হলেও সাবেক সঙ্গীর অ্যাকাউন্ট দেখার কোনো না কোনো উপায় খুঁজে বের করে তারা।

স্টিনা বলেন, তার সাবেক সঙ্গী ও তার নতুন সঙ্গীর ওপর নজর রাখতে একটি ফেক প্রোফাইল তৈরি করেছেন তিনি। যাতে তারা কখনও টের না পায়।

ইউনিভার্সিটি অব বেডফোর্ডশায়ারের জাতীয় সাইবারস্টকিং গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক এবং মনোবিজ্ঞানী এমা শর্ট, বিশ্লেষণ করেছেন, কীভাবে অনলাইন স্পেস আমাদেরকে সবকিছুর সঙ্গে জড়িত না হয়েও সবকিছু পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দেয়। তবে এমন সুযোগ আমাদের 'সীমানা' সম্পর্কে সচেতন থাকার চেতনাকে দুর্বল করে দেয়।

মানুষ সম্পর্কে নজর রাখা আসলে খারাপ কিছু নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের নজর রাখতে এতো বেশি সুযোগ করে দেয়, যা করা উচিত নয়, যা অনেক সময় আমরা আসলে করতে চাইও না। কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এখন মোহগ্রস্ত আচরণ এমনভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব যা ভিন্ন পরিবেশ আসলে মোহগ্রস্ত মনে হবে না।

আপনি চাইলে আপনার সাবেক সঙ্গীর প্রোফাইল দিনে ১০০ বার দেখতে পারেন। আপনার দৈনন্দিন স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডও চালিয়ে যেতে পারবেন। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, স্বাভাবিক আচরণ করা দেখলে মনে হবে আপনি আপনার খেয়াল রাখছেন, বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে না যে কোনো সমস্যা আছে।

কিন্তু আপনি যদি আপনার সাবেক সঙ্গীর অফিসের বাইরে গিয়ে হাজির হন এবং জানালা দিয়ে দিনে আট ঘণ্টা তার দিকে তাকিয়ে থাকেন, তবে সেটি ভিন্ন বিষয়।

আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ তথ্য রয়েছে আমাদের হাতে
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অন্যের জীবনে আমাদের উঁকি মারার একটি জানালা খুলে দেয়। সুযোগ করে দেয় বিশাল তথ্য ভাণ্ডারে প্রবেশের, যা আগে কখনও ছিল না।

অনলাইনে আমরা যে তথ্য দিই- যখন কারো সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়ে চেক ইন দিই কিংবা কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর কথা জানাই, তখন সেটি নতুন নতুন সূত্র ও সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি করে। বিপরীতমুখী ঈর্ষার সমস্যা রয়েছে- এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে সঙ্গীর অতীত জীবন নিয়ে জানার আগ্রহ অনেক বেশি হতে পারে। অতীতে, কারো সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পর তার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানার তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু এখন এটি বেশ সহজ।

কমেডিয়ান অ্যানড্রিয়া হাবার্ট বলেন, তার যখন ২০ বছর বয়স ছিল, তখন তার সঙ্গী তাকে ছেড়ে যায়। তার সঙ্গে যোগাযোগের সব পথ বন্ধ করে দেয় সে। এমনকি এমন আচরণ শুরু করে, তার জীবনে তার অস্তিত্বই কখনও ছিল না। তিনি জানতেন, তার সঙ্গী অন্য কারও সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পর নিয়মিত তাকে অনলাইনে স্টক করা শুরু করেন। এটি তিনি বার বারই করতে লাগলেন।

অ্যানড্রিয়া বলেন, 'যখন আপনাকে বাধা দেওয়ার কেউ নেই, তখন আপনি অন্যের প্রোফাইলে দিনে ৬০-৭০ বার দেখবেন। নিজের ক্ষতি করার অত্যন্ত সূক্ষ্ম মাধ্যম অনলাইনে কিছু দেখাকে আসলে নির্দিষ্টভাবে তেমন ক্ষতিকর মনে হয় না। কিন্তু আসলে নিজের একটু একটু করে ক্ষতি করছেন আপনি। নিজের ক্ষতি করার অতি সূক্ষ্ম একটি মাধ্যম এটি।'

অ্যানড্রিয়া আরো বলেন, 'সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারজনিত আচরণ যে তার ভোগান্তিকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল- তা তিনি বুঝতে পারতেন। আপনি যে দুঃখ অনুভব করছেন তা কমানোর জন্য স্থায়ী একটি সমাধান খুঁজবেন আপনি, কিন্তু আপনি যা খুঁজছেন তা কখনও পাবেন না।'

মনোবিজ্ঞানী এমা শর্ট সহমত দেন, যারা সাইবারস্টকিং বা মোহগ্রস্ত অনলাইন আচরণ করেন, তাদের স্বাস্থ্যের ওপর এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এসব আচরণ ভুক্তভোগীদের একই ধরনের আচরণ বার বার করার দিকে ঠেলে দেয়। এটি আসলে তাদের জন্য কোনো ফল বয়ে আনে না।

এমা বলেন, 'আপনি কোন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাবেন না। আর সামাজিক জীব হিসেবে সেখানে আমাদের থাকা উচিত নয়। কোন কিছুর পেছনে এত শ্রম আর শক্তি ব্যয় করার পরও আপনি কোনো প্রতিদান না পেলে তা আপনার আত্মসম্মানও বাড়াবে না।'

এ ধরনের সমস্যায় করণীয়
সম্প্রতি গবেষণাগুলো থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো মানুষ যখন অনুভব করে তারা অনলাইনে অন্যের পেছনে অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে বা তারা যদি তাদের আচরণ নিয়ে দোষী অনুভব করে তাহলে সে বিষয়ে তাদের কথা বলা উচিত।

এমা বলেন, 'বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলুন। যারা মনে করেন, তাদের জীবন এতটাই প্রভাবিত হয়েছে যে তারা আটকে গেছেন বলে অনুভব করছেন, তাদের জন্য পেশাদারদের সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।'

জ্যাক বলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পুরো সমস্যাটাই আসলে তার সৃষ্টি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শুধু এটাকে আরো বেশি খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে... 'এটি থেকে বেরিয়ে আসার শুরুতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, শিগগির আমাকে এগুলো ছেড়ে দিতে হবে।'

অনলাইনে তিনি কম সময় ব্যয় করতে শুরু করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি যাতে তার সাবেক সঙ্গীর বিষয়ে আগ্রহী না হন তা কঠোরভাবে অনুসরণ শুরু করেন। বলেন, 'আপনাকে সেই লোভ সামলাতে বেশ কঠোর হতে হবে। কারণ ওই লোভ সহসাই আপনাকে ছেড়ে যাবে না।'

আর অ্যানড্রিয়া বলেন, তিনি জানতেন, সামনে এগিয়ে যেতে হলে ভিন্ন পথে এগুতে হবে তাকে। সম্পর্ক ভাঙার পর অনলাইনে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি। কারণ তিনি আবার মোহগ্রস্তদের মতো আচরণে অভ্যস্ত হতে চাননি।

অ্যানড্রিয়া আরো বলেন, 'সমস্যাটি বুঝতে পারাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। তারপর থেকে আর কোনো সাবেক সঙ্গীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল দেখেননি তিনি।'

সূত্র : বিবিসি বাংলা

বিজনেস আওয়ায়/২০ জুলাই/ আরআই

উপরে