ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬

রিফাত হত্যা

এমপি পুত্র সুনাম কেন আসামি না!

২০১৯ সেপ্টেম্বর ০৪ ০৯:২৫:১৪

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক (বরগুনা) : বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় স্থানীয় সাংসদপুত্র সুনাম দেবনাথকে আসামি না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন আসামি। মঙ্গলবার আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় কয়েকজন আসামি চিৎকার করে এমপি পুত্রের নাম নেয়।

এ সময় তাঁরা বলেন, এটা অন্যায়, এটা অবিচার। সুনাম দেবনাথ কেন আসামি নাই, সুনাম দেবনাথ হত্যার নির্দেশদাতা, সে কেন আসামি নাই, এটা অবিচার, এটা অন্যায়।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রিফাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ১৪ আসামিকে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম মো. সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে হাজির করা হয়।

বিচারক আসামিদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছয়জনকে যশোর শিশু-কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে এবং বাকিদের বরগুনা কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর মামলার পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।

সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে আদালত চত্বরে রাখা প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় মামলার ১ নম্বর আসামি রিফাত ফরাজী ও তাঁর ভাই রিশান ফরাজীসহ অন্য আসামিরা চিৎকার করে রিফাত হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে সুনাম দেবনাথের নাম বলে।

প্রিজন ভ্যানে তোলার পরও আসামিরা চিৎকার করে সুনামের কথা বলে যাচ্ছিল। রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার পর থেকেই নানা কারণে সুনাম আলোচনায় আসেন।

উল্লেখ্য, গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ওই দিন রাতে রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সেখানে মিন্নিকে প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল।

এ ঘটনার পর সুনাম দেবনাথ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে মিন্নিকে খলনায়ক বানানোর চেষ্টা করেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘এখন যাকে মিডিয়া হিরো বানাচ্ছে, সে-ই এ ঘটনার ভিলেন হতে পারে।

এরপর গত ২ জুলাই মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। এরপর গত ১৩ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ পুত্রবধূর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তিনি মিন্নির গ্রেপ্তার দাবি করেন।

সেদিন সংবাদ সম্মেলনের আগে-পরে সুনাম দেবনাথ বরগুনা প্রেস ক্লাবে গিয়েছিলেন। পরদিন মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছিল।

সুনাম দেবনাথ ওই কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে মামলার তদন্তের স্বার্থে রিফাতের বাবার অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে পুলিশকে অনুরোধ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এরপর রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত নতুন মোড় নেয়।

১৬ জুলাই আসামি শনাক্তের কথা বলে মিন্নিকে তাঁর বাবার বাসা থেকে পুলিশ লাইনসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে টানা প্রায় ১২ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে তাঁকে রিফাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

পরদিন ১৭ জুলাই মিন্নিকে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে সোপর্দ করে সাত দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াননি।

সুনামের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হুমকির কারণেই তাঁর পক্ষে আইনজীবী দাঁড়াননি বলে অভিযোগ করেন মিন্নির বাবা। রিমান্ডের তৃতীয় দিন শেষে মিন্নিকে গোপনে জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে মিন্নি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

বিচারক যখন তাঁর খাসকামরায় মিন্নির জবানবন্দি গ্রহণ করছিলেন তখন মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর আদালত প্রাঙ্গণে চিৎকার করে বলছিলেন, এ সব কিছুই শম্ভুবাবুর খেলা। তাঁর ছেলে সুনাম দেবনাথকে সেভ করার জন্য আমার মেয়েকে বলি দেওয়া হচ্ছে।

রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার পর থেকেই মিন্নির বিরোধিতা শুরু করেন। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ভায়রার দুই ছেলে রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন।

এরপর আর তাঁদের বিরুদ্ধে সুনামকে অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। হঠাৎ করেই আদালত চত্বরে সুনাম দেবনাথের বিরুদ্ধে চিৎকার করে রিফাত-রিশানের এমন বক্তব্য দেওয়ার ব্যাপারে অনেকেই হতবাক হয়েছে।

অসমর্থিত সূত্র বলছে, রিফাত হত্যা মামলায় মিন্নিকে প্রধান আসামি এবং রিফাত ও রিশানকে আসামির তালিকায় শেষ দিকে রাখার কথা ছিল। তাই শুরু থেকেই রিফাত ও রিশান মামলার ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি।

তাঁদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও তেমন কিছু আসেনি। কিন্তু প্রধান আসামি নয়ন নিহত হওয়ায় রিফাতকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে অভিযোগপত্রে।

হাইকোর্টে মিন্নির প্রথম জামিন শুনানির সময় পুলিশ প্রশাসনকে তাঁর ব্যাপারে অতি উৎসাহী বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন আদালত। আদালত মিন্নিকে জামিনের আদেশ দেন। এর পরই মিন্নিকে পরিকল্পনাকারী হিসেবে ৭ নম্বর আসামি করে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।

গতকাল আদালত চত্বরে আসামিরা চিৎকার করে যে বক্তব্য দিয়েছে সে বিষয়ে সুনাম দেবনাথ বলেন, আপনারা জানেন আসামিদের একটি অংশ আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। ওই প্রতিপক্ষের ছত্রচ্ছায়ায় এরা এসব অপকর্ম করে বেড়াত।

তাদের শেখানো কথাই এখন আসামিরা বলে আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখুন, ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে কেউ কোথাও আমার সম্পৃক্ত থাকার কথা বলেছে কি না। যদি সেখানে তারা এসব না বলে থাকে, তবে এখন এমন বক্তব্যের মানে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।

বিজনেস আওয়ার/০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯/এ

উপরে