businesshour24.com

ঢাকা, শনিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২০, ৫ মাঘ ১৪২৬


'অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর চিত্র উপস্থাপন করেছে গাম্বিয়া'

০৩:৫২পিএম, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আইসিজেতে হওয়া মামলার শুনানি চলছে নেদারল্যান্ডসের হেগে। চলতি বছরের নভেম্বরে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এ মামলা করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। ১০ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ৩ দিনব্যাপী এ মামলার শুনানিতে বর্তমানে হেগে অবস্থান করছে মিয়ানমার ও গাম্বিয়ার প্রতিনিধি দল।

গাম্বিয়ার দায়েরকৃত মামলার শুনানির জবাবে অংশ নিয়ে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি বলেন, দুঃখজনকভাবে রাখাইনের অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর চিত্র উপস্থাপন করেছে গাম্বিয়া।

বক্তব্যের শুরুতে সু চি আর্ন্তজাতিক আইন ও সনদসমূহের বাধ্যবাধকতার বিষয়ে কথা বলেন। যখন দেশের বিচার ব্যবস্থা ব্যর্থ হবে, শুধু তখনই আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এর বিচার করতে পারবে জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব সেনার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ প্রমাণিত হবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। যদি মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এমন কোনো কাজ করে থাকে; যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। তাহলে দেশের সংবিধান অনুযায়ী তাদের বিচার হবে।

রাখাইন পরিস্থিতি জটিল এবং রোহিঙ্গারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে স্বীকার করেছেন সু চি।

মঙ্গলবার নেদারল্যান্ডসের রাজধানী দ্য হেগে জাতিসংঘের শীর্ষ এই আদালতে সাবেক গণতন্ত্রের প্রতীক সু চিকে রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানায় মামলার বাদী আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে টানা আন্দোলন করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিলেন সু চি; কিন্তু এখন সেই সেনাবাহিনীর পক্ষ নিয়েই গণহত্যার দায় এড়াতে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রক্তাক্ত এক সামরিক অভিযান চালিয়ে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। রক্তাক্ত এই অভিযানে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও চালানো হয়। প্রাণে বাঁচতে সেই সময় রোহিঙ্গাদের ঢল নামে প্রতিবেশী বাংলাদেশে।

পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষুদে মুসলিম দেশ গাম্বিয়া ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্যদের উৎসাহে গণহত্যার দায়ে মামলা করে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতে তোলে।

কিন্তু একটি ব্যাপারে অনেকেরই কৌতূহল তৈরি হয়েছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বে নেতৃস্থানীয় এতো দেশ থাকতে গাম্বিয়াই কেন মামলা করতে গেলো? রোহিঙ্গা সঙ্কটে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী বাংলাদেশও তো এমন একটি মামলার কথা ভাবেনি। বর্তমান দুনিয়ায় দেশগুলো যেখানে পরস্পরের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কূটনৈতিক ফায়দা তুলতে ব্যতিব্যস্ত, সে সময়ে গাম্বিয়া কেন এমন অবস্থান নিলো?

এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। গাম্বিয়া ইসলামি দেশগুলোর সংস্থা ওআইসি’র অন্যতম সদস্য। ওইআইসি এ মামলার ক্ষেত্রে গাম্বিয়াকে বিশেষভাবে সমর্থন দিচ্ছে। এছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যু তদন্তে গঠিত ওআইসির কমিটির প্রধানও ছিল গাম্বিয়া। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দেশটির মামলা করার অন্যতম বড় কারণ এটি।

গাম্বিয়ার পক্ষে গণহত্যার এ মামলাটি করেছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনমন্ত্রী আবু বকর এম তাম্বাদু। তিনি বেশ কয়েক বছর জাতিসংঘের গণহত্যা বিষয়ক একটি ট্রাইবুনালে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন। ওই ট্রাইবুনালে ১৯৯৪ সালে মধ্য আফ্রিকার আরেক দেশ রুয়ান্ডায় সংঘটিত গণহত্যার বিচার চলছিল। ফলে গণহত্যার স্বরূপ ও ভয়াবহতা সম্পর্কে খুব ভালো করেই অবহিত ছিলেন তিনি।

সেই তাম্বাদুই রোহিঙ্গা ইস্যুতে গঠিত ওইআইসির তদন্ত কমিটির জেরে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেন। সে সময় সহিংসতার শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুঃসহ স্মৃতি তাকে রুয়ান্ডার রক্তাক্ত গণহত্যার কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় গোত্রীয় সহিংসতায় প্রায় ৮ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়।

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চালানো হত্যা, ধর্ষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে রুয়ান্ডার ইতিহাসের সাদৃশ্য তাড়া করে গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রীকে। রোহিঙ্গা গণহত্যা প্রসঙ্গে জাতিসংঘ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পড়েও তাদের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েন তিনি। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করার পেছনে গাম্বিয়ার এই মানবিক তাড়নাও অন্যতম প্রভাবক।

এসবের বাইরে গাম্বিয়ার নিজেরও রয়েছে রক্তাক্ত এক অতীত। ২০১৭ সালে একনায়ক ইয়াহিয়া জাম্মের ২২ বছরের শাসন থেকে মুক্ত হয় এ দেশ। ইয়াহিয়ার শাসনামলে একের পর এক নৃশংসতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এ দেশকে। ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার বেশ কিছু মানুষকে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

সার্বিক প্রেক্ষাপটেই রাখাইনের রোহিঙ্গাদের প্রতি সহমর্মী হয়ে ওঠে গাম্বিয়া। শেষমেশ চলতি বছরের নভেম্বরে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে মানবিকতার বিরল নজির স্থাপন করে দেশটি। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে নিপীড়িত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়।

বিজনেস আওয়ার/১১ ডিসেম্বর, ২০১৯/আরআই

এই বিভাগের অন্যান্য খবর

উপরে