ঢাকা, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬


'শেয়ারবাজার উন্নয়নের পূর্বশর্ত আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা'

০১:১৩পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, ২০১০-১১ সালে শেয়ারবাজারে পতনের কারন হিসাবে অনেক কিছু সনাক্ত করি। এরমধ্যে অন্যতম কারণ ছিল আর্থিক হিসাবে (ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টে) কোম্পানিগুলোর প্রকৃত অবস্থা ছিল না। অথচ শেয়ারবাজারের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক আর্থিক হিসাব। যা বাস্তবায়নের জন্য এবং সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) তৈরী করা হয়েছে।

বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে আগারগাঁওয়ের বিএসইসি মাল্টিপারপাস হলে ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ডিটেকশন অব ফ্রড’ বিষয়ক সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা ২০১১ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর অন্যতম দুইটি দাবি ছিল। দাবি দুইটির মধ্যে একটি হলো স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা এবং অন্যটি হলো ফাইন্যান্সিয়াল রিপোটিং অ্যাক্ট করা। আমাদের দাবির ফলে সরকার ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট পালার্মেন্টে পাস করে।

খায়রুল হোসেন বলেন, আজকে সবাইকে নিয়ে এই সেমিনার করার উদ্দেশ্য হলো সাংবাদিকরা যা বুঝে যাবে, স্টেকহোল্ডাররা যদি অন্যভাবে বুঝে তাহলে সেখানে গণ্ডগোল থেকে যাবে। কাজেই আমি চাচ্ছি আমরা সবাই একইসাথে এবং একইরকমভাবে বুঝি। একইসাথে তাদের জ্ঞান ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করা, টেকনিকগুলো তাদের আয়ত্ব করা। যাতে করে এই শেয়ারবাজারে সাংবাদিকেরা আইপিও অনুমোদনের আগেই সমস্যাগুলো ধরতে পারে। তাতে করে রেগুলেটররা অর্থাৎ আমরা অনেক শক্তিশালী হবো ও বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবে। এছাড়া শেয়ারবাজার স্থিতিশীলতার দিকে যাবে ও শক্তিশালী হবে। আল্টিমেটলি একটা মার্কেট গড়ে তুলতে আমার অনেকটা সমর্থন হবে। কারণ ইনফর্মেশনে যদি গলদ থাকে কোনো দিন কার্যকর মার্কেট গড়ে উঠবে না।

আমাদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রটেকশন অব ইন্টারেস্ট অব ইনভেস্টর। যে অসহায় বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরত, তাদের প্রতিটা বেদনা, যেভাবে তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি হতে হতো, সেগুলো অ্যাড্রেস করার উপায় তারা কমপ্লেইন্ট মডিউলের মাধ্যমে পেলো। আমরা আজকে পরিসংখ্যানের মাধ্যমে দেখলাম যে, ৯৫ শতাংশ সমস্যা অ্যাড্রেস করা হয়েছে। কাজেই এই মডিউলটা সৃষ্টি করে সকল স্টেকহোল্ডারদের জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি হয়েছে।

ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট বিশ্লেষণের উপর কেন আমরা গুরুত্ব দিয়েছি উল্লেখ করে খায়রুল হোসেন বলেন, আমরা সাংবাদিকদের প্রাধান্য দিয়ে আজকে এই মিটিংটি আয়োজন করেছি। আমি বারবার বলি যে সমাজে কি ঘটছে, ক্যাপিটাল মার্কেটে কি ঘটছে, অর্থনীতিতে কি ঘটছে এগুলোকে জনগণের সামনে তুলে ধরার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো সাংবাদিকেরা। তাদের বোঝাপড়া যদি পরিস্কার থাকে, তাহলে অনেক কিছুই পরিস্কার হয়ে যাবে। তাদেরকে শক্তিশালী করার জন্যই আজকের এই সেমিনার।

ফাইন্যান্সিয়াল রিপোটিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট। ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট কাদের জন্য দরকার উল্লেখ করে বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, কোম্পানির নিজের জন্য দরকার, যারা বিশ্লেষন করে তাদের জন্য, বিনিয়োগকারীর জন্য, যারা মার্জার ইকুইজেশন করছে তাদের জন্য, যারা ভেঞ্জার, ক্যাপিটাল, ইমপেক্ট ফান্ড ও প্রাইভেট ইকুইটি ইনভেস্ট করছে তাদের জন্য এবং ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে ক্রেডিট রেটিং করার ক্ষেত্রে বিচার করার জন্য দরকার। অনেক ক্ষেত্রেই দরকার। কিন্তু ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট যদি প্রকৃত অবস্থার চিত্র ফুটে না উঠে, তাহলে সে স্টেটমেন্ট কাজে দিবে না।

তিনি বলেন, উন্নত দেশে ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টে প্রকৃত চিত্র উঠে আসে। এতে ওইসব দেশের কোম্পানির পারফরমেন্স, অতীতের পারফরমেন্স এবং ভবিষতের সম্ভাবনা ধারনা করা যায়। আমাদের দেশে তার উল্টোটা।

খায়রুল হোসেন বলেন, আমরা জানি কম্পিউটার কিছুই না। আর্থিক হিসাবের ইনপুট যদি ভুল থাকে, সেখানে যদি মিথ্যা ও কৃত্রিম তথ্য থাকে, অতিমূল্যায়িত বা অবমূল্যায়িত তথ্য থাকে, তা দ্বারা আপনি যতই বিশ্লেষন করেন, এতে বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কাজেই সেজন্য ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট বিশ্লেষনে বিভিন্ন যে দিকগুলো আছে, সেগুলো আপনারা জেনে নিবেন।

বিনিয়োগকারী বিনিয়োগের আগে কি দেখেন উল্লেখ করে খায়রুল হোসেন আরো বলেন, বিনিয়োগকারী দেখে এই কোম্পানিটির ডিভিডেন্ড প্রদান করার সামর্থ্য আছে কিনা। তারা আরেকটা জিনিস দেখবে, তা হলো কোম্পানিটির ইনকাম জেনারেশন এবং ক্যাশ ফ্লো কি হবে। এরপর বিনিয়োগকারীরা দেখবে কোম্পানিটির অতীত কি ছিল, বর্তমান পারফরমেন্স কি এবং ভবিষ্যতটা কি। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সেক্টরের মধ্যে কোম্পানিটির অবস্থা কি। এরপরে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কোম্পানি নিজে যদি মনে করে আমার ব্যালেন্স সিট ঠিক আছে, আমার অন্যান্য স্টেটমেন্টগুলো ঠিক আছে। তাহলে সে দেখবে রিটার্ন এবং ইকুইটি কোন অপারেশন্স থেকে বেশি আসছে। তাহলে সে অপারেশন্সকে সাপোর্ট দিতে গেলে আমার সম্প্রসারণ কোন দিকে নিতে হবে। সম্প্রসারণ কোথায় বেশি হচ্ছে অর্থাৎ কস্ট মিনিমাইজেশন এবং ইনকাম জেনারেশন মেক্সিমাইজেশন করার যথেস্ট পরিকল্পনাটিও যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারবে কি না। অন্যথায় কোম্পানি নিজে যেমন বঞ্চিত হবে, মার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বিনিয়োগকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মার্কেটে স্থিতিশীলতা থাকবে না।

ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট তৈরি করে কোম্পানি। তারা ইনপুট দেওয়া তথ্যে কাজ করে অডিটর। কাজেই তাদের দায়িত্ব কি? আজকে অনেকে বলবে আমাদের একটি অডিট করলে যেই পরিমাণ টাকা দেয়, সে পরিমাণ টাকায় আমরা করতে পারছি না। এজন্য আমরা এপ্রিল মাসে অডিটরদের নিয়ে একটা সেমিনার করবো। তাদের দায়-দায়িত্ব কি, তাদের দূর্বলতা কি? আমরা সেগুলোকে সনাক্ত করে তুলে ধরবো। অডিটররা যদি বলে ঠিক মতো তাদের টাকা-পয়সা দেয়া হয় না। সেগুলো আমরা সনাক্ত করার চেষ্টা করবো, একইসাথে তাদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনবো। যারা প্যানেল অডিট আছে, তারা যাতে দায়িত্বটা যথাযথভাবে পালন করে, সে ব্যবস্থা আমরা নিবো।

তিনি বলেন, কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রথম প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি লোকসান ২ পয়সা, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১২ পয়সা ও তৃতীয় প্রান্তিকে ২৪ পয়সা লোকসান। কিন্তু হঠাৎ করেই পরবর্তী প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি মুনাফা ২.৫০ টাকা। আবার ফার্স্ট কোয়াটার, সেকেন্ড কোয়াটারে ইপিএস হলেও ফাইনালি দেখালো ইপিএস ফল্ট করেছে। এমন অসত্য প্রাইস সেনসেটিভ ইনফর্মেশন দিয়ে কিছু বিনিয়োগকারীকে সর্বশান্ত করে কোম্পানিগুলো সুবিধা নিচ্ছে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা একদিকে শক্তিশালী, অন্যদিকে অসহায়। একটা রেগুলেটরে মাত্র ৮৪ জন অফিসার। আর পিয়ন ও দায়োয়ান নিয়ে আমরা ১৬০ জন কাজ করি। আমাদের এরিয়া অব কাভারেজ বাংলাদেশ ব্যাংকের চেয়েও অনেক বড়। তারা শুধু ব্যাংক এবং নন-ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন নিয়ে কাজ করে। তাদের সেখানে ৭ থেকে ৮ হাজার লোকবল রয়েছে। আমরা ব্যাংক এবং নন-ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন, মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউজ, স্টক এক্সচেঞ্জ, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, ফার্ম ম্যানেজার এবং ক্রেডিট রেটিং কোম্পানি থেকে শুরু করে আনলিস্টেড কোম্পানির সবাইকে আমাদের কাভার করতে হয়। অথচ আমাদের লোকবল মাত্র ৮৪ জন। অর্গনোগ্রাম হচ্ছে হচ্ছে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে। কিন্তু এখনো লোকবল নিয়োগ করার পর্যায়ে আমরা পৌছাইনি।

আমরা অসহায়ত্ববোধ কোথায় করি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোম্পানির মধ্যে অডিট কমিটির প্রধান হবেন একজন স্বাধীন পরিচালক, সিএফও’র দায়িত্ব কি, এমডির দায়িত্ব কি, চেয়ারম্যানের দায়িত্ব কি, অডিটরের দায়িত্ব কি- এসব কিছু নির্ধারন করে দেওয়া হয়েছে। এরপরে ডিসক্লোজার ভিত্তিতে আইপিও দেওয়ার পরেও সমস্ত দোষ পরে কমিশনের উপরে। সেকেন্ডারি মার্কেট পরে গেলেও কমিশনকে দোষারোপ। অথচ আমাদের কোন বিনিয়োগ নাই। আমরা কারসাজি হলে ধরি, ডিমান্ড-সাপ্লাই ঠিক রাখি এবং এখানে যদি কেউ রিউমার ছড়ায়, তাদেরকে আইনের আওতায় আনি। তারপর মার্কেট উঠা-নামা করার জন্য আমাদেরকে সমস্ত দোষ দেওয়া হয়। রেগুলেটের হিসাবে এখানে অসয়াত্ববোধ আমাদের।

অনুষ্ঠানে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ একাডেমি অব সিকিউরিটি মার্কেটিংয়ের (বিএএসএম) ডিজি মো: মাহবুবুল আলম, বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ আহমেদ, বিএসইসির পরিচালক কামরুল আনাম খান, এফআরসির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ, সিডিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও শুভ্র কান্তি চৌধুরী, সিএমজেএফের প্রেসিডেন্ট হাসান ইমাম রুবেল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিনান্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

বিজনেস আওয়ার/২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০/আরএ

এই বিভাগের অন্যান্য খবর

মঙ্গলবার শেয়ারবাজারে ১৬ ব্যাংকের বিনিয়োগ
শেয়ারবাজারে ধীরে ধীরে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ছে

উপরে